ফয়সল আহমদ নুমান,কোম্পানীগঞ্জ
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ৫নং উত্তর রণিখাই ইউনিয়নে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও শ্মশানঘাট সংলগ্ন এলাকা থেকে রাতের আঁধারে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মহোৎসব চলছে। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী দুই পক্ষের ‘অশুভ আঁতাতের’ কারণে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা ও নিয়মিত অভিযান সত্ত্বেও বন্ধ হচ্ছে না এই লুটতরাজ। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি দলের পরিচয় ব্যবহার করে এক নেতা মাঠ পর্যায়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, আর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের এক নেতা যোগান দিচ্ছেন ভারী যন্ত্রপাতি। এছাড়া পুলিশের কথিত কিছু কর্মকর্তা ও এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, উত্তর রণিখাই ইউনিয়নের কালাইরাগ গ্রামের নয়াবাজারের পূর্বে, শ্মশানঘাটের উত্তরে এবং কালাইরাগ বড় মসজিদের দক্ষিণে প্রতিদিন রাত ১টা ৩০ মিনিট থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, গভীর রাতে ও ভোরে ড্রেজার ও এক্সকাভেটর (ভেকু) দিয়ে বড় বড় গর্ত করে বালু তোলা হচ্ছে। এতে মসজিদ ও শ্মশানঘাট ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অনুসন্ধানে এই অবৈধ কারবারের নেপথ্যে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, এই বালু উত্তোলন সিন্ডিকেটের মূল নেতৃত্বে রয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রভাবশালী নেতা শাহাবুদ্দিন, কলাবাড়ী গ্রামের আব্দুল বারীর পুত্র। অন্যদিকে, বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত অত্যন্ত ব্যয়বহুল এক্সকাভেটর বা ভেকু মেশিনের মালিক হিসেবে নাম এসেছে উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রজন মিয়ার। রাজনৈতিকভাবে দুই মেরুর বাসিন্দা হলেও অবৈধ বালু ব্যবসার ক্ষেত্রে তারা একাট্টা হয়ে কাজ করছেন বলে এলাকায় ব্যাপক গুঞ্জন রয়েছে।
এদিকে উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রজন মিয়া জানান, তিনি বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত নন। এক্সকাভেটর বা ভেকু মেশিনের মালিকও তিনি নন। এটি তার ভাই ভাড়া করে এনেছেন।
শাহাবুদ্দিনের এই সিন্ডিকেটে মাঠ পর্যায়ে আরও সক্রিয় রয়েছেন ফয়জুরের ছেলে দুলাল, রুহেল আহমেদ, গিয়াস, কলাবাড়ী গ্রামের আমিনুল হক, সাজ্জাদ, রফিক, লাইনম্যান আব্দুল হান্নানের ছেলে হাফিজুর এবং বশিরের ছেলে হেলাল।
গভীর রাতে এবং ভোরবেলায় বালু উত্তোলনের একাধিক ভিডিও ফুটেজ স্থানীয়দের মাধ্যমে এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে সরকারের কোটি টাকার সম্পদ পাচার করা হচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, শাহাবুদ্দিনের প্রভাব ও রজন মিয়ার যন্ত্রপাতির দাপটে সাধারণ মানুষ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকেও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম খানের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি গুরুত্বের সাথে শুনেছেন। তিনি জানান, “বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখছি। যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমি বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মহোদয়কেও জানানোর পরামর্শ দিচ্ছি।” পুলিশের পক্ষ থেকে নিয়মিত টহল জোরদার এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রবিন মিয়ার সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
দীর্ঘদিন ধরে এভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তীরবর্তী ফসলি জমি এবং মসজিদ-শ্মশান সংলগ্ন এলাকা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। সচেতন মহল মনে করছেন, রাজনৈতিক পরিচয় ছাপিয়ে এই ‘বালু খেকো’ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নিলে চিরস্থায়ী পরিবেশগত বিপর্যয় নেমে আসবে এই এলাকায়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তার কঠোর হস্তক্ষেপে এই অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ হবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন কালাইরাগ গ্রামবাসী।
Leave a Reply